প্রকাশের তারিখ : ১০ মে ২০২৬
কাউরে বাঁচাইয়া রাখি নাই, ৫ খুনে চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি
গাজীপুরের কাপাসিয়ায় নিজ ঘরে এক পরিবারের পাঁচজনকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। শুক্রবার মধ্যরাতে উপজেলার রাউৎকোনা (পূর্বপাড়া) গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। গতকাল শনিবার (৯ মে) সকালে তাদের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায় পুলিশ।
নিহতরা হলেন—ওই বাড়ির গৃহকর্তা ফোরকান মিয়ার স্ত্রী শারমিন খানম (৩২), তার তিন মেয়ে মিম (১৪), হাবিবা (১০), ফারিয়া (২) এবং শ্যালক রসুল (২২)। নিহত শারমিনের ভাগনে সাকিব জানান, শ্যালক রসুলকে চাকরি দেওয়ার কথা বলে শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টায় ফোনে ডেকে নিয়ে আসেন দুলাভাই ফোরকান। পরে রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষে ঘুমিয়ে পড়লে স্ত্রী, শ্যালক এবং তিন মেয়েকে গলা কেটে হত্যা করেন। ফোরকান ঘটনার পর থেকে পলাতক আছেন। অভিযুক্ত ফোরকান মিয়া গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার মেরী গোপীনাথপুর গ্রামের মো. আতিয়ার রহমানের ছেলে। ফোরকানের পরিবার প্রায় পাঁচ বছর ধরে গাজীপুরের রাউৎকোনা গ্রামের ওই বাড়িতে ভাড়া থাকত। ফোরকান প্রাইভেটকার চালাতেন। আর তার শ্যালক রসুল গাজীপুর সদরের একটি কারখানায় চাকরি করতেন। নিহতদের স্বজনের দাবি, শুক্রবার রাত ১২টায় ফোরকান তার আত্মীয় মিশকাতকে ফোন করে বলেন, ‘সবাই মরে গেছে, কাউরেই বাঁচাইয়া রাখি নাই।’ এরপর থেকেই তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। নিহত শারমিনের আরেক ফুফু ইভা আক্তার গণমাধ্যমকে বলেন, ফোরকান তার ভাই মিশকাতকে ফোন দিয়ে বলেন, ‘আমার সব শেষ হয়ে গেছে। সবাইকে মাইরা ফেলছি।
আমারে আর তোরা পাবি না।’ খবর পেয়ে তারা পাঁচ থেকে ছয়জন সকালে ঘটনাস্থলে যান। গিয়ে দেখেন, ভবনের কলাপসিবল গেট খোলা। নিচতলার কক্ষগুলোর দরজাও খোলা। ভেতরে গিয়ে তারা মেঝে ও বিছানায় নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখেন। পরে জাতীয় জরুরি সেবা-৯৯৯ নম্বরে ফোন করে বিষয়টি জানানো হয়। একই সঙ্গে তারা কাপাসিয়া থানায় রওনা হন। আরেক বিয়ে নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মনোমালিন্য: ইভা আক্তারের দাবি, ফোরকান মিয়া আরেকটি বিয়ে করার কথা স্ত্রীকে জানিয়েছিলেন। এ নিয়ে শারমিন খুব মনঃক্ষুণ্ন ছিলেন। তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন মনোমালিন্য চলছিল। ছয় থেকে সাত মাস আগে ফোরকান শারমিনকে মারধর করেছিলেন। এতে তার শরীরের বিভিন্ন অংশ ফুলে যায়। পরে তাকে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়। সুস্থ হওয়ার পর তিনি বাবার বাড়িতে থাকছিলেন। কয়েক দিন পর ফোরকান আবার স্ত্রীকে সেখান থেকে নিয়ে আসেন। এরপরও দ্বিতীয় বিয়ের প্রসঙ্গ নিয়ে তাদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ চলছিল। শারমিন স্বামীকে জানিয়েছিলেন, তার সন্তানদের নিয়ে কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই, তাই স্বামীর সঙ্গেই থাকতে চান। ইভা আক্তার বলেন, ‘আমার ভাতিজিসহ বাকি সবাইকে ফোরকান মিয়া হত্যা করেছে বলেই মনে হচ্ছে। আমরা এর কঠোর বিচার চাই।’
পুলিশ বলেছে, ঘটনার পর স্বজনদের কাছে ফোনকলের তথ্য তারা পেয়েছে এবং সেটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। একই সঙ্গে সন্দেহজনকভাবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুজনকে আটক করা হয়েছে। কাপাসিয়া ও কালীগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান জানান, প্রাথমিকভাবে ফোরকানের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত ছিল কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে হত্যায় ব্যবহৃত বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে পুলিশ ও ফরেনসিক টিম। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, হত্যাকাণ্ডটি পূর্বপরিকল্পিত হতে পারে। ‘স্ত্রীসহ কাউকে জীবিত রাখবে না’: নিহত শারমিনের ভাই শাহীন মোল্লা জানান, ফোরকান ও শারমিনের দাম্পত্য সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই খারাপ ছিল। প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদ হতো। কিছুদিন আগে শারমিন অসুস্থ হয়ে বাবার বাড়িতে চিকিৎসাধীন থাকাকালে ফোরকান হুমকি দিয়েছিলেন—‘স্ত্রীসহ কাউকে জীবিত রাখবেন না।’ পরিবার তখন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, শারমিনকে আর স্বামীর কাছে পাঠানো হবে না। কিন্তু পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় আবার সংসার শুরু করেন তারা। স্বজনদের দাবি, ঘটনার আগের দিন ফোরকান ফোন করে শ্যালক রসুলকে কাপাসিয়ায় ডেকে নেন। রাজেন্দ্রপুরের একটি পোশাক কারখানায় ১৯ হাজার ৫০০ টাকা বেতনের চাকরি দেওয়ার কথা বলে তাকে বাসায় আনা হয়। সন্ধ্যার দিকে রসুল সেখানে পৌঁছান। এরপর রাতেই ঘটে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড। বিদেশে পালানোর পরিকল্পনা: স্বজনদের ভাষ্য, ফোরকান সম্প্রতি তার ব্যবহৃত প্রাইভেটকার একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে মাসিক ৪০ হাজার ৫০০ টাকায় ভাড়া দেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু গাড়ি কিংবা টাকার কোনো খোঁজ মিলছিল না। পরিবারের সন্দেহ, হত্যাকাণ্ডের আগেই দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করছিলেন তিনি।
তার পাসপোর্ট প্রস্তুত ছিল এবং শনিবার বিদেশ যাওয়ার কথাও স্বজনরা শুনেছেন। ছোট্ট শিশুদের মৃত্যুতে এলাকায় শোক: স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শুক্রবার বিকেলেও শিশু তিনটি বাড়ির সামনে খেলাধুলা করেছিল। সকালে মানুষের চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা ছুটে এসে ঘরের ভেতরে একের পর এক মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। স্থানীয় বাসিন্দা আমান উল্লাহ বলেন, ‘স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হতো। কিন্তু ছোট ছোট শিশুদের এভাবে হত্যা করবে, এটা কেউ ভাবতে পারেনি।’ বর্তমানে বাড়িটি ঘিরে রেখেছে পুলিশ। পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। কাপাসিয়ার মানুষ এখন একটাই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে—একজন বাবা কীভাবে নিজের সন্তানদের এত নির্মমভাবে হত্যা করতে পারে? গোপালগঞ্জে শারমিনের পরিবারে মাতম: নিহত শারমিন আক্তার গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার পাইককান্দি উত্তর চরপাড়া গ্রামের শাহাদাত মোল্লা চৌকিদারের মেয়ে। শাহাদাত মোল্লা ও ফিরোজা বেগম দম্পতির চার মেয়ে ও তিন ছেলের মধ্যে শারমিন ছিলেন তৃতীয় ও রসুল সবার ছোট। তাদের বড় মেয়ে কয়েক বছর আগে মারা যান। এবার একসঙ্গে আরও দুই সন্তানকে হারাল পরিবারটি। গতকাল সকালে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার পাইককান্দি উত্তর চরপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সন্তান ও নাতি-নাতনিদের হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন নিহত শারমিন আক্তার ও রসুল মোল্লার মা ফিরোজা বেগম। বুক চাপড়ে বিলাপ করতে করতে বলছিলেন, ‘আমার বাবারে মাইরা ফ্যালাইছে। আমার কলিজার ধনডারে শেষ কইরা দিল। আমি এখন কী নিয়ে বাঁচমু...।’ শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন তিনি। জ্ঞান ফিরতেই বিলাপ করে বলছিলেন, ‘আমার বাজান গতকাল (শুক্রবার) নতুন জামা-প্যান্ট কিনছে। সেই জামা পইরা হাসতে হাসতে বোনের বাসায় গেছে। কে জানত, ওই যাওয়াই শেষ যাওয়া! আমার রসুল, আমার ছোট ছেলে, আমার বুকের ধন।
তোরা আমার রসুলরে আইনা দে...।’ গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় নিহত শারমিন খানমের বাবা মো. সাহাদৎ মোল্লা কাপাসিয়া থানায় মামলাটি করেন। মামলায় স্ত্রী, তিন সন্তান ও শ্যালককে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত ফোরকান মিয়াকে প্রধান আসামি করে হত্যা মামলা করা হয়েছে। মামলায় আরও কয়েকজন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন ওসি শাহিনুর আলম। এদিকে ঘটনাস্থল থেকে একটি লিখিত কাগজ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সেখানে পারিবারিক বিরোধ, অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব ও স্ত্রীর বিরুদ্ধে থানায় দেওয়া বিভিন্ন অভিযোগের কথা উল্লেখ ছিল। তবে অভিযোগের সত্যতা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি
সম্পাদক : মোহাম্মাদ আবু বকর সিদ্দিক, নির্বাহী সম্পাদক : নূর হাসান আকাশ , বার্তা সম্পাদক : মেহেদী হাসান তালুকদার , প্রকাশক : মোহাম্মাদ আমিনুল ইসলাম .. বার্তা বাণিজ্য কার্যালয় : ২১৭ ফকিরাপুল প্রথম লেন,আরামবাগ,মতিঝিল । ঢাকা-১০০০। যোগাযোগ: +8801744552281 ইমেইল : newspriyotimes@gmail.com