গণতন্ত্রে বাকস্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার। তবে এই স্বাধীনতা কখনোই সীমাহীন নয়; দায়িত্ববোধহীন ব্যবহারই সেটিকে সংকটে পরিণত করে। সাম্প্রতিক সময়ে যে প্রবণতা চোখে পড়ছে, তা উদ্বেগজনক—নীতিনির্ধারকদের কাজের গঠনমূলক সমালোচনার বদলে অশ্লীল ভাষা, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবেশকে ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তপ্ত করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী, তারেক রহমানসহ বিভিন্ন মন্ত্রী-এমপিদের নিয়ে নীতি বা কার্যক্রমের সমালোচনা না করে সরাসরি গালিগালাজে নেমে পড়া—এটি কোনো সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা নয়। বরং এটি এমন এক সংস্কৃতি তৈরি করছে, যেখানে যুক্তি হারিয়ে যাচ্ছে, জায়গা নিচ্ছে বিদ্বেষ ও উত্তেজনা। পরিকল্পিতভাবে এমন বক্তব্য ছড়িয়ে দিয়ে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের উস্কে দেওয়া হচ্ছে, যার ফল হিসেবে দেখা দিচ্ছে পাল্টাপাল্টি প্রতিক্রিয়া, এমনকি সংঘর্ষ-সংঘাতও। এতে জনমত গঠনের পরিবর্তে বিভ্রান্তি বাড়ছে, আর সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গণতান্ত্রিক সমাজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে হলো—যুক্তি, তথ্য ও শালীনতার ভিত্তিতে মতামত দেওয়া। সমালোচনা অবশ্যই থাকবে, এবং সেটিই গণতন্ত্রের শক্তি। কিন্তু যখন সেই স্বাধীনতা ব্যবহার করে বিদ্বেষ ছড়ানো হয়, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা হয়, তখন সেটি আর স্বাধীনতা থাকে না; বরং আইনের আওতায় পড়ার মতো অপরাধে রূপ নেয়। বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশ এ ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট সীমারেখা টেনে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে সংবিধানের প্রথম সংশোধনী বাকস্বাধীনতাকে শক্তভাবে সুরক্ষা দিলেও সহিংসতায় উস্কানি, মানহানি বা অশ্লীলতা আইনত দণ্ডনীয়। জার্মানিতে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বা ইতিহাস বিকৃতির মতো বিষয় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত—কারণ তারা জানে, অসংযত বক্তব্য সামাজিক শান্তি নষ্ট করতে পারে। ভারতেও বাকস্বাধীনতা রয়েছে, তবে জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে যুক্তিসঙ্গত সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। এই উদাহরণগুলো আমাদের একটি মৌলিক সত্য শেখায়—বাকস্বাধীনতা মানে যা খুশি বলা নয়, বরং দায়িত্বশীলভাবে বলা। গণতন্ত্রে ভিন্নমত থাকবে, কঠোর সমালোচনাও থাকবে; কিন্তু তা হতে হবে তথ্যনির্ভর, যুক্তিপূর্ণ এবং শালীন। গালিগালাজ বা কুরুচিপূর্ণ আক্রমণ কোনোভাবেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অংশ হতে পারে না। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এই ভারসাম্য রক্ষা করা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করার নামে যদি ভাষার সীমা ভেঙে ফেলা হয়, তবে সেটি কেবল ব্যক্তিকে নয়, পুরো রাষ্ট্রকেই অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
শেষ পর্যন্ত কথা একটাই—বাকস্বাধীনতা গণতন্ত্রের শক্তি, কিন্তু সেই শক্তি যেন বিশৃঙ্খলার অস্ত্র না হয়ে ওঠে। কী বলা হচ্ছে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ—কীভাবে বলা হচ্ছে।
লেখক মিরাজুল ইসলাম

সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ এপ্রিল ২০২৬
গণতন্ত্রে বাকস্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার। তবে এই স্বাধীনতা কখনোই সীমাহীন নয়; দায়িত্ববোধহীন ব্যবহারই সেটিকে সংকটে পরিণত করে। সাম্প্রতিক সময়ে যে প্রবণতা চোখে পড়ছে, তা উদ্বেগজনক—নীতিনির্ধারকদের কাজের গঠনমূলক সমালোচনার বদলে অশ্লীল ভাষা, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবেশকে ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তপ্ত করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী, তারেক রহমানসহ বিভিন্ন মন্ত্রী-এমপিদের নিয়ে নীতি বা কার্যক্রমের সমালোচনা না করে সরাসরি গালিগালাজে নেমে পড়া—এটি কোনো সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা নয়। বরং এটি এমন এক সংস্কৃতি তৈরি করছে, যেখানে যুক্তি হারিয়ে যাচ্ছে, জায়গা নিচ্ছে বিদ্বেষ ও উত্তেজনা। পরিকল্পিতভাবে এমন বক্তব্য ছড়িয়ে দিয়ে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের উস্কে দেওয়া হচ্ছে, যার ফল হিসেবে দেখা দিচ্ছে পাল্টাপাল্টি প্রতিক্রিয়া, এমনকি সংঘর্ষ-সংঘাতও। এতে জনমত গঠনের পরিবর্তে বিভ্রান্তি বাড়ছে, আর সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গণতান্ত্রিক সমাজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে হলো—যুক্তি, তথ্য ও শালীনতার ভিত্তিতে মতামত দেওয়া। সমালোচনা অবশ্যই থাকবে, এবং সেটিই গণতন্ত্রের শক্তি। কিন্তু যখন সেই স্বাধীনতা ব্যবহার করে বিদ্বেষ ছড়ানো হয়, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা হয়, তখন সেটি আর স্বাধীনতা থাকে না; বরং আইনের আওতায় পড়ার মতো অপরাধে রূপ নেয়। বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশ এ ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট সীমারেখা টেনে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে সংবিধানের প্রথম সংশোধনী বাকস্বাধীনতাকে শক্তভাবে সুরক্ষা দিলেও সহিংসতায় উস্কানি, মানহানি বা অশ্লীলতা আইনত দণ্ডনীয়। জার্মানিতে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বা ইতিহাস বিকৃতির মতো বিষয় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত—কারণ তারা জানে, অসংযত বক্তব্য সামাজিক শান্তি নষ্ট করতে পারে। ভারতেও বাকস্বাধীনতা রয়েছে, তবে জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে যুক্তিসঙ্গত সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। এই উদাহরণগুলো আমাদের একটি মৌলিক সত্য শেখায়—বাকস্বাধীনতা মানে যা খুশি বলা নয়, বরং দায়িত্বশীলভাবে বলা। গণতন্ত্রে ভিন্নমত থাকবে, কঠোর সমালোচনাও থাকবে; কিন্তু তা হতে হবে তথ্যনির্ভর, যুক্তিপূর্ণ এবং শালীন। গালিগালাজ বা কুরুচিপূর্ণ আক্রমণ কোনোভাবেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অংশ হতে পারে না। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এই ভারসাম্য রক্ষা করা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করার নামে যদি ভাষার সীমা ভেঙে ফেলা হয়, তবে সেটি কেবল ব্যক্তিকে নয়, পুরো রাষ্ট্রকেই অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
শেষ পর্যন্ত কথা একটাই—বাকস্বাধীনতা গণতন্ত্রের শক্তি, কিন্তু সেই শক্তি যেন বিশৃঙ্খলার অস্ত্র না হয়ে ওঠে। কী বলা হচ্ছে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ—কীভাবে বলা হচ্ছে।
লেখক মিরাজুল ইসলাম

আপনার মতামত লিখুন