শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের এক ফোনেই কোটি টাকা
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি বা এ সংক্রান্ত এডহক কমিটি গঠনে শিক্ষামন্ত্রীর ভূমিকা রাখারই কোনো সুযোগ নেই। কারণ এ সংক্রান্ত কোনো নথি মন্ত্রণালয়ে আসে না। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেওয়ার প্রয়োজনও হয় না।
জেলা প্রশাসন, বিভাগীয় কমিশনার এবং শিক্ষা বোর্ড পর্যন্ত এর চূড়ান্ত অনুমোদন হয়। কিন্তু অতি সম্প্রতি রাজধানীর মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় এবং কলেজের এডহক কমিটি নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের এক ফোনের পর তুলকালাম কাণ্ড বেধে যায় ঢাকা শিক্ষা বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট মহলে। এডহক কমিটি গঠিত হয়ে গেছে এবং এ সংক্রান্ত চিঠিও ইস্যু হয়ে গেছে।
কিন্তু চিঠি ইস্যুর মাত্র ১৫ মিনিটের মাথায় ঢাকা শিক্ষা বোর্ডকে নতুন এই এডহক কমিটি বাতিলের জন্য আরেকটি চিঠি ইস্যু করতে হয়েছে। বাতিলের চিঠির কপি মন্ত্রীর কাছে পাঠাতে হয়েছে। মন্ত্রীর এই ফোনের কারণ উদঘাটন করতে গিয়ে জানা গেছে, কোটি টাকার বাণিজ্য। জানা যায়, ঢাকা জেলা প্রশাসন এবং বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের অনুমোদনের পর গত ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় এন্ড কলেজের চার সদস্যের এডহক কমিটির অনুমোদন দেয় ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। নিয়ম অনুযায়ী ঢাকার শিক্ষা বোর্ডে এই কমিটির চূড়ান্ত অনুমোদনের কাজ সম্পন্ন হয়।
কিন্তু শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদন সংক্রান্ত চিঠি ইস্যুর মাত্র ১৫ মিনিটের মাথায় ফোন আসে শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন স্বয়ং ফোন করেন। চেয়ারম্যান ভাবছিলেন, এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে জরুরি কোনো নির্দেশনার জন্য মন্ত্রী ফোন করেছেন। কিন্তু আদতে দেখা গেলো ভিন্ন ইস্যু। মনিপুর স্কুলের কমিটি গঠন নিয়ে মন্ত্রীর আপত্তি। মন্ত্রী বলছেন, এই কমিটি বাতিল করতে। চেয়ারম্যান যুক্তি দেখালেন, চিঠি ইস্যু হয়ে গেছে। এমনকি সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছেও গেছে। এখন বাতিল করতে গেলে জটিলতা বাড়বে।
কিন্তু মন্ত্রী নাছোড়বান্দা! নতুন আরেকটা চিঠি ইস্যু করে ওই কমিটি বাতিলের জন্য বলছেন মন্ত্রী। চেয়ারম্যান কিছুটা অবাকই হলেন, একটা কমিটি গঠনের ইস্যু নিয়ে মন্ত্রী এতটা সিরিয়াস কেন- নিজের মনকেই প্রশ্ন করলেন। তাও এটি স্থায়ী কমিটি নয়, মাত্র ছয় মাসের জন্য এই কমিটি। এরপরে আবারও নতুন করে কমিটি গঠিত হবে তখন তো অবশ্যই মন্ত্রীর ইচ্ছে পূরণ করা যাবে। এখনই এ জটিলতা কেন? তবে উপায় নেই। মন্ত্রীর নির্দেশ মানতেই হবে। এর বাইরে যাওয়ার কোনোই সুযোগ নেই। তাতে চাকরি হারানোর আশংকা রয়েছে। কলেজ পরিদর্শক প্রফেসর মুনসী হুমায়ুন কবীরকে তলব করলেন চেয়ারম্যান। নির্দেশ দিলেন মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবগঠিত এই কমিটি বাতিলের জন্য। কলেজ পরিদর্শক বাধ্য হয়েই তা করলেন।
অনুমোদিত কমিটির সদস্যদের মাথার ওপর যেন বাজ পড়লো। ছয় মাসের এই কমিটি গঠন করতে গিয়ে জেলা প্রশাসন কার্যালয় থেকে শুরু করে শিক্ষা বোর্ড পর্যন্ত অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে তাদের। কারণ, মনিপুর স্কুলের গভর্নিং বডি মানেই অনেক লোভনীয় বিষয়, কোটি কোটি টাকা আয়ের সুযোগ আছে এতে। পদে পদে সবাইকে খুশী করতে হয়েছে। কিন্তু সবকিছু সম্পন্ন হওয়ার পর এখন উটকো বাগড়া দিয়েছেন স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী। নতুন কমিটির সভাপতি দৌড়ে গেলেন শিক্ষামন্ত্রীর কাছে। মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন তাকে উল্টো দোষারোপ করলেন, তুমি আগে আমার কাছে আসো-নি কেন? তিনি মন্ত্রীকে জবাব দিলেন, কমিটি গঠনের বিষয়ে আগাম আপনাকে জানাতে হবে, এটাতো জানা ছিল না! মন্ত্রী বললেন, এখন এই কমিটি রিভাইভ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এটা রিভাইভ করতে হলে প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নিতে হবে। কমিটির সভাপতি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন, প্রধানমন্ত্রীর কেন অনুমতি নিতে হবে? প্রধানমন্ত্রী কি এই কমিটির কথা জানেন? মন্ত্রী অন্য কাজের ব্যস্ততা দেখালেন।
এ প্রসঙ্গে আর আসলেন না। কমিটির সদস্যরা পরবর্তীতে কথা বললেন মন্ত্রীর পিএস’র সঙ্গে (বর্তমানে যিনি শিক্ষা অধিদপ্তরের ডিজি পদেও আছেন)। মন্ত্রীর পিএস তাদের অপেক্ষা করতে বললেন। কিন্তু অপেক্ষা তো আর তেমন একটা সম্ভব হচ্ছে না। একদিন পরে আবারও পিএস’র সঙ্গে সাক্ষাত করা হলো। পিএস জানালেন, প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নিতে হবে। এরজন্য মন্ত্রীকে কোটি টাকা দিতে হবে। এরও একদিন পরে কমিটির সদস্যরা বাধ্য হলেন পিএস’র প্রস্তাব মেনে নিতে। ফলে অবশেষে গত ২২ এপ্রিল কলেজ পরিদর্শক মুনসী হুমায়ুন কবীর স্বাক্ষরিত আরেকটি চিঠি ইস্যু হলো। তাতে লেখা রয়েছে, “উপর্যুক্ত বিষয় ও সূত্রের প্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগরী এর মিরপুর থানায় অবস্থিত মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় এন্ড কলেজ এর এডহক কমিটি অনুমোদনপত্র বাতিল সংক্রান্ত সুত্রোক্ত ২ নং পত্রটি এতদ্বারা বাতিল পূর্বক প্রত্যাহার করা হলো।
জানা গেছে, এই এক কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন মিরপুরেরই একজন ব্যবসায়ী, যিনি মনিপুর স্কুল এন্ড কলেজ সংশ্লিষ্ট ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন দীর্ঘদিন ধরে। এটা সকলেরই জানা কথা, দেশের সবচেয়ে বড় এবং প্রসিদ্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় এবং কলেজ। এতে প্রায় ৩৩ হাজার শিক্ষার্থী এবং প্রায় সাতশ’ শিক্ষক আছেন। আওয়ামী লীগ আমলে তখনকার বহুল আলোচিত অধ্যক্ষ ফরহাদ হোসেন এবং তার সাঙ্গপাঙ্গরা এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
এর সঙ্গে তখনকার প্রতিমন্ত্রী এবং এমপি কামাল আহমেদ মজুমদারও জড়িত ছিলেন (বর্তমানে যিনি কারাগারে আছেন)। গণমাধ্যমে এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে এবং সরকারের একাধিক তদন্তেও এসব দুর্নীতি প্রমাণিত হয়েছে। তারপরও অধ্যক্ষ ফরহাদ হোসেনের বিরুদ্ধে আইনগত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যায়নি কামাল মজুমদারের সংশ্লিষ্টতার কারণে। এমনকি পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যে এডহক কমিটি গঠিত হয়েছিল এই কমিটিও কোটি কোটি টাকা দুর্নীতি ও আত্মসাত করেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের তদন্তেই এটি প্রমাণিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, আর্থিক দুর্নীতির কথা বাদ দিলেও ৩৩ হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষা সরঞ্জাম এবং বৃহত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত ব্যবসার মাধ্যমেই আয় হয়ে থাকে কোটি কোটি টাকা। তাই সকলেরই চোখ এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির দিকে। অবশেষে শিক্ষামন্ত্রীরও চোখ এড়ালো না।
২ ঘন্টা আগে