জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। গতকাল মঙ্গলবার জাতিসংঘের সদরদপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের প্রার্থীকে হারিয়ে বিজয়ী হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।
জাতিসংঘের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, আঞ্চলিকভাবে ঘূর্ণমান পদ্ধতিতে এবার এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে সভাপতি পেল জাতিসংঘ। জাতিসংঘের পাঁচটি আঞ্চলিক গোষ্ঠী পর্যায়ক্রমে এই সভাপতি পদে প্রতিনিধিত্ব করেন। এবার সভাপতিত্বের দায়িত্ব পড়েছে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় গোষ্ঠীর ভাগে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির প্রধান দায়িত্ব হলো, সাধারণ পরিষদের অধিবেশন পরিচালনা করা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনাকে সমন্বয় করা। নিরপেক্ষভাবে সকল রাষ্ট্রকে আস্থায় এনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেন সাধারণ পরিষদের সভাপতি।
জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের সাবেক মূখ্য লেখক ও পরিচালক ড. সেলিম জাহান বলেন, ‘সভাপতির দায়িত্বের একটা বিশেষ দিক হচ্ছে, সভাপতি অত্যন্ত নির্মোহভাবে, নিরপেক্ষভাবে সাধারণ পরিষদের কার্যপ্রণালি সামনে নেবে। কখনোই যেন এটা মনে না হয় যে, সভাপতি একটি দিকে বা একটা গোষ্ঠীর দিকে কোন রকমের পক্ষপাত দেখাচ্ছেন।’
জাতিসংঘের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে খলিলুর রহমান এই এক বছরের দায়িত্ব পালন করবেন। এ সময়ে জাতিসংঘের সেক্রেটারি-জেনারেল আন্তোনিও গুতেরেসের উত্তরসূরি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। গুতেরেসের মেয়াদ এ বছরের ৩১শে ডিসেম্বর শেষ হচ্ছে। সাধারণ পরিষদের সভাপতি জাতিসংঘের প্রধান নির্বাহী নন।
জাতিসংঘের প্রশাসনিক প্রধান হলেন সংস্থাটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবির বিবিসি বাংলাকে বলেন, এখানে তার কাজ হলো (সাধারণ পরিষদের সভাপতি) এই এজেন্ডাগুলোর ওপর ডিসকাশন করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সেটা ভোটাভুটিতে হয় কনসেনশাসেও হয়। এই অধিবেশনে বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানরা অংশ নেন।
তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা ও আলোচনার পরে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার কাজটিও করেন সভাপতি। সাধারণ পরিষদের গ্রহণ করা দুইটি সিদ্ধান্ত খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান সাবেক এই কূটনীতিক, ‘একটা সিদ্ধান্ত মূলত খুব গুরুত্বপূর্ণ, সেটা হচ্ছে জাতিসংঘের যে পিস কিপিং বাজেট হয় সেটা হয় সাধারণ পরিষদে। এটা সাধারণত কনসেনশাস বেইজড হয়।’
তিনি বলেছেন, ‘জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির এই কাজ খুব গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে এটার ম্যান্ডেটটা হয় সিকিউরিটি কাউন্সিলে, তারপর বাজেটিংটা হয় সাধারণ পরিষদে। এটা সাধারণ পরিষদের খুবই শক্তিশালী একটা ক্ষমতা। এই পরিষদের যিনি সভাপতি থাকেন এখানে তার একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। প্রতি দুই বছর পর পর জাতিসংঘের বাজেট অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। পুরো জাতিসংঘের অর্থাৎ এর অধীনে থাকা ছয়টি সংস্থার মোট বাজেট পরিচালনার কাজও করে থাকে সাধারণ পরিষদ। বাংলাদেশের সাবেক এই কূটনীতিক বলেন, ‘জাতিসংঘের অর্থ পরিচালনার কাজটা পুরোটাই মোটাদাগে সাধারণ পরিষদ করে এবং এখানে যিনি সভাপতি হন তার একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। এই দুটো ম্যান্ডেটরি বিষয় মানতে বাধ্য জাতিসংঘের সকল সদস্য রাষ্ট্র। এছাড়া সাধারণ পরিষদের বাকি অন্যান্য কাজগুলো সুপারিশ করার কাজ বলে জানান তিনি। সাধারণ পরিষদের আরেকটি ক্ষমতা আছে, যখন নিরাপত্তা পরিষদ কোনো সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয় তখন সদস্য রাষ্ট্ররা সেই প্রস্তাবটিকে সাধারণ পরিষদে নিয়ে আসে। ইউনাইটেড নেশনস নিউজ (ইউএন নিউজ) এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘খলিলুর রহমান ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক সংকট, জাতিসংঘের সংস্কার প্রচেষ্টা এবং বড় ধরনের নেতৃত্ব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বছরে এই বিশ্ব সংস্থাটিকে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্বে এলেন।’
বাংলাদেশের প্রচারণায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে কার্যকর বহুপাক্ষিকতা, জাতিসংঘের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, উন্নয়নশীল দেশসমূহের স্বার্থ সংরক্ষণ, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট বাস্তবায়ন, শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অবদান এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের কণ্ঠস্বরকে আরও শক্তিশালী করার বিষয়গুলো। বাংলাদেশের প্রচারণা ছিল বিষয়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে, যেখানে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমশ বাড়ছে, সেখানে বাংলাদেশ সংলাপ, সহযোগিতা এবং ঐকমত্যভিত্তিক কূটনীতির ওপর জোর দিয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার এই ঐতিহাসিক বিজয় অর্জনের জন্য জাতিসংঘের সদস্য দেশসমূহের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে এবং জাতিসংঘের মূলনীতি ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে তার দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছে।
_1.png)
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ জুন ২০২৬
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। গতকাল মঙ্গলবার জাতিসংঘের সদরদপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের প্রার্থীকে হারিয়ে বিজয়ী হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।
জাতিসংঘের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, আঞ্চলিকভাবে ঘূর্ণমান পদ্ধতিতে এবার এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে সভাপতি পেল জাতিসংঘ। জাতিসংঘের পাঁচটি আঞ্চলিক গোষ্ঠী পর্যায়ক্রমে এই সভাপতি পদে প্রতিনিধিত্ব করেন। এবার সভাপতিত্বের দায়িত্ব পড়েছে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় গোষ্ঠীর ভাগে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির প্রধান দায়িত্ব হলো, সাধারণ পরিষদের অধিবেশন পরিচালনা করা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনাকে সমন্বয় করা। নিরপেক্ষভাবে সকল রাষ্ট্রকে আস্থায় এনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেন সাধারণ পরিষদের সভাপতি।
জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের সাবেক মূখ্য লেখক ও পরিচালক ড. সেলিম জাহান বলেন, ‘সভাপতির দায়িত্বের একটা বিশেষ দিক হচ্ছে, সভাপতি অত্যন্ত নির্মোহভাবে, নিরপেক্ষভাবে সাধারণ পরিষদের কার্যপ্রণালি সামনে নেবে। কখনোই যেন এটা মনে না হয় যে, সভাপতি একটি দিকে বা একটা গোষ্ঠীর দিকে কোন রকমের পক্ষপাত দেখাচ্ছেন।’
জাতিসংঘের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে খলিলুর রহমান এই এক বছরের দায়িত্ব পালন করবেন। এ সময়ে জাতিসংঘের সেক্রেটারি-জেনারেল আন্তোনিও গুতেরেসের উত্তরসূরি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। গুতেরেসের মেয়াদ এ বছরের ৩১শে ডিসেম্বর শেষ হচ্ছে। সাধারণ পরিষদের সভাপতি জাতিসংঘের প্রধান নির্বাহী নন।
জাতিসংঘের প্রশাসনিক প্রধান হলেন সংস্থাটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবির বিবিসি বাংলাকে বলেন, এখানে তার কাজ হলো (সাধারণ পরিষদের সভাপতি) এই এজেন্ডাগুলোর ওপর ডিসকাশন করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সেটা ভোটাভুটিতে হয় কনসেনশাসেও হয়। এই অধিবেশনে বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানরা অংশ নেন।
তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা ও আলোচনার পরে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার কাজটিও করেন সভাপতি। সাধারণ পরিষদের গ্রহণ করা দুইটি সিদ্ধান্ত খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান সাবেক এই কূটনীতিক, ‘একটা সিদ্ধান্ত মূলত খুব গুরুত্বপূর্ণ, সেটা হচ্ছে জাতিসংঘের যে পিস কিপিং বাজেট হয় সেটা হয় সাধারণ পরিষদে। এটা সাধারণত কনসেনশাস বেইজড হয়।’
তিনি বলেছেন, ‘জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির এই কাজ খুব গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে এটার ম্যান্ডেটটা হয় সিকিউরিটি কাউন্সিলে, তারপর বাজেটিংটা হয় সাধারণ পরিষদে। এটা সাধারণ পরিষদের খুবই শক্তিশালী একটা ক্ষমতা। এই পরিষদের যিনি সভাপতি থাকেন এখানে তার একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। প্রতি দুই বছর পর পর জাতিসংঘের বাজেট অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। পুরো জাতিসংঘের অর্থাৎ এর অধীনে থাকা ছয়টি সংস্থার মোট বাজেট পরিচালনার কাজও করে থাকে সাধারণ পরিষদ। বাংলাদেশের সাবেক এই কূটনীতিক বলেন, ‘জাতিসংঘের অর্থ পরিচালনার কাজটা পুরোটাই মোটাদাগে সাধারণ পরিষদ করে এবং এখানে যিনি সভাপতি হন তার একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। এই দুটো ম্যান্ডেটরি বিষয় মানতে বাধ্য জাতিসংঘের সকল সদস্য রাষ্ট্র। এছাড়া সাধারণ পরিষদের বাকি অন্যান্য কাজগুলো সুপারিশ করার কাজ বলে জানান তিনি। সাধারণ পরিষদের আরেকটি ক্ষমতা আছে, যখন নিরাপত্তা পরিষদ কোনো সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয় তখন সদস্য রাষ্ট্ররা সেই প্রস্তাবটিকে সাধারণ পরিষদে নিয়ে আসে। ইউনাইটেড নেশনস নিউজ (ইউএন নিউজ) এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘খলিলুর রহমান ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক সংকট, জাতিসংঘের সংস্কার প্রচেষ্টা এবং বড় ধরনের নেতৃত্ব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বছরে এই বিশ্ব সংস্থাটিকে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্বে এলেন।’
বাংলাদেশের প্রচারণায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে কার্যকর বহুপাক্ষিকতা, জাতিসংঘের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, উন্নয়নশীল দেশসমূহের স্বার্থ সংরক্ষণ, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট বাস্তবায়ন, শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অবদান এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের কণ্ঠস্বরকে আরও শক্তিশালী করার বিষয়গুলো। বাংলাদেশের প্রচারণা ছিল বিষয়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে, যেখানে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমশ বাড়ছে, সেখানে বাংলাদেশ সংলাপ, সহযোগিতা এবং ঐকমত্যভিত্তিক কূটনীতির ওপর জোর দিয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার এই ঐতিহাসিক বিজয় অর্জনের জন্য জাতিসংঘের সদস্য দেশসমূহের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে এবং জাতিসংঘের মূলনীতি ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে তার দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছে।
_1.png)
আপনার মতামত লিখুন