লেখক মোঃ মিরাজুল ইসলাম
বাংলাদেশে অপরাধের বিস্তার নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। চুরি, ছিনতাই, মাদক, সংগঠিত অপরাধ—সব মিলিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বারবার। এমন বাস্তবতায় অনেকেই দ্রুত সমাধানের নামে বিচারবহির্ভূত পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা স্পষ্টভাবে বলে—অপরাধ দমনের টেকসই পথ কখনোই আইনের বাইরে নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের Miranda v. Arizona মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দেয়, অভিযুক্ত ব্যক্তির মৌলিক অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখা ব্যতীত নেওয়া স্বীকারোক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। এর মাধ্যমে একটি বিষয় প্রতিষ্ঠিত হয়—রাষ্ট্রের ক্ষমতা যত বড়ই হোক, তা আইনি সীমার ভেতরেই প্রয়োগ করতে হবে। একইভাবে Gideon v. Wainwright মামলায় বলা হয়, একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হলেও তার ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে, এবং প্রয়োজনে রাষ্ট্র তাকে আইনজীবী দেবে। অর্থাৎ, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই অপরাধ দমনের মূল ভিত্তি। যুক্তরাজ্যের R v. Jogee মামলায় অপরাধে জড়িত থাকার দায় নির্ধারণে কঠোর মানদণ্ড আরোপ করা হয়, যাতে প্রমাণ ছাড়া কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা না যায়। অন্যদিকে ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের McCann and Others v. United Kingdom মামলায় বলা হয়, রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ হতে হবে ‘প্রয়োজনীয়’ ও ‘অনুপাতিক’।
এর বাইরে গেলে তা মানবাধিকার লঙ্ঘন। এই উদাহরণগুলো আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে—অপরাধ দমনে শক্তি নয়, প্রয়োজন ন্যায়বিচার ও প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা। বাংলাদেশের বাস্তবতায় বড় একটি সমস্যা হলো, গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত অনেকেই সহজেই জামিন পেয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এতে জননিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই পেশাদার অপরাধী এবং সংবেদনশীল অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোর জামিন নীতি প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। আদালতকে জামিন প্রদানের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনা করতে হবে—অভিযুক্ত ব্যক্তি পুনরায় অপরাধে জড়াতে পারে কি না, সাক্ষীদের প্রভাবিত করার সম্ভাবনা আছে কি না, এবং অপরাধের প্রকৃতি কতটা গুরুতর। এ ধরনের মামলায় প্রয়োজন হলে জামিন সীমিত বা স্থগিত রাখা যেতে পারে, যাতে বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত না হয়। একইসঙ্গে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকলে অপরাধীরা সাহসী হয়ে ওঠে, আর ভুক্তভোগীরা হতাশ হয়ে পড়ে। ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত, আধুনিক তদন্ত ব্যবস্থা এবং কার্যকর সাক্ষী সুরক্ষা—এই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। ‘ক্রসফায়ার’ কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। এটি হয়তো সাময়িকভাবে ভীতি সৃষ্টি করে, কিন্তু আইনের শাসনের ভিতকে দুর্বল করে দেয়। বিচারবহির্ভূত ব্যবস্থা যত বাড়বে, ততই জনগণের আস্থা কমবে, আর ন্যায়বিচারের ধারণা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি আইনের শাসনের পথে এগোবো, নাকি শর্টকাটের ঝুঁকিপূর্ণ পথে হাঁটবো? একটি সভ্য ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য একমাত্র পথ হলো—কঠোর কিন্তু ন্যায্য বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করা। অপরাধ দমন করতে হলে আইনের ভেতরেই শক্ত হতে হবে। ‘ক্রসফায়ার’ নয়, বিচারই হোক শেষ কথা।
তথ্যসূত্র: আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার আলোকে

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ এপ্রিল ২০২৬
লেখক মোঃ মিরাজুল ইসলাম
বাংলাদেশে অপরাধের বিস্তার নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। চুরি, ছিনতাই, মাদক, সংগঠিত অপরাধ—সব মিলিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বারবার। এমন বাস্তবতায় অনেকেই দ্রুত সমাধানের নামে বিচারবহির্ভূত পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা স্পষ্টভাবে বলে—অপরাধ দমনের টেকসই পথ কখনোই আইনের বাইরে নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের Miranda v. Arizona মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দেয়, অভিযুক্ত ব্যক্তির মৌলিক অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখা ব্যতীত নেওয়া স্বীকারোক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। এর মাধ্যমে একটি বিষয় প্রতিষ্ঠিত হয়—রাষ্ট্রের ক্ষমতা যত বড়ই হোক, তা আইনি সীমার ভেতরেই প্রয়োগ করতে হবে। একইভাবে Gideon v. Wainwright মামলায় বলা হয়, একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হলেও তার ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে, এবং প্রয়োজনে রাষ্ট্র তাকে আইনজীবী দেবে। অর্থাৎ, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই অপরাধ দমনের মূল ভিত্তি। যুক্তরাজ্যের R v. Jogee মামলায় অপরাধে জড়িত থাকার দায় নির্ধারণে কঠোর মানদণ্ড আরোপ করা হয়, যাতে প্রমাণ ছাড়া কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা না যায়। অন্যদিকে ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের McCann and Others v. United Kingdom মামলায় বলা হয়, রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ হতে হবে ‘প্রয়োজনীয়’ ও ‘অনুপাতিক’।
এর বাইরে গেলে তা মানবাধিকার লঙ্ঘন। এই উদাহরণগুলো আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে—অপরাধ দমনে শক্তি নয়, প্রয়োজন ন্যায়বিচার ও প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা। বাংলাদেশের বাস্তবতায় বড় একটি সমস্যা হলো, গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত অনেকেই সহজেই জামিন পেয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এতে জননিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই পেশাদার অপরাধী এবং সংবেদনশীল অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোর জামিন নীতি প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। আদালতকে জামিন প্রদানের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনা করতে হবে—অভিযুক্ত ব্যক্তি পুনরায় অপরাধে জড়াতে পারে কি না, সাক্ষীদের প্রভাবিত করার সম্ভাবনা আছে কি না, এবং অপরাধের প্রকৃতি কতটা গুরুতর। এ ধরনের মামলায় প্রয়োজন হলে জামিন সীমিত বা স্থগিত রাখা যেতে পারে, যাতে বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত না হয়। একইসঙ্গে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকলে অপরাধীরা সাহসী হয়ে ওঠে, আর ভুক্তভোগীরা হতাশ হয়ে পড়ে। ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত, আধুনিক তদন্ত ব্যবস্থা এবং কার্যকর সাক্ষী সুরক্ষা—এই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। ‘ক্রসফায়ার’ কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। এটি হয়তো সাময়িকভাবে ভীতি সৃষ্টি করে, কিন্তু আইনের শাসনের ভিতকে দুর্বল করে দেয়। বিচারবহির্ভূত ব্যবস্থা যত বাড়বে, ততই জনগণের আস্থা কমবে, আর ন্যায়বিচারের ধারণা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি আইনের শাসনের পথে এগোবো, নাকি শর্টকাটের ঝুঁকিপূর্ণ পথে হাঁটবো? একটি সভ্য ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য একমাত্র পথ হলো—কঠোর কিন্তু ন্যায্য বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করা। অপরাধ দমন করতে হলে আইনের ভেতরেই শক্ত হতে হবে। ‘ক্রসফায়ার’ নয়, বিচারই হোক শেষ কথা।
তথ্যসূত্র: আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার আলোকে

আপনার মতামত লিখুন